ইউ.এফ..

ডঃ অয়ন মুখোপাধ্যায়

        বিজ্ঞানের জয়যাত্রা আমাদের জীবনযাত্রার মানকে যেমন অন্য এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে তেমনি মনের অন্তরালে থাকা অজস্র রহস্যের সমাধানসূত্র আমাদের সামনে মেলে ধরেছে। এককালে যাকে আমরা অলৌকিক বলে মনে করতাম, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমাদের মনের অনুসন্ধিৎসা মিটিয়েছে। তবুও কিছু রহস্যের উত্তর আজও আমাদের কাছে অজানা, বা অস্বচ্ছ থেকে গেছে। যেমন অন্য গ্রহের জীব বা এলিয়ন, পূর্বজন্মের স্মৃতি, ইয়েতির আবির্ভাব, ইউ.এফ.. প্রভৃতি। বহু মানুষ কৌতুহলি এসব বিষয় নিয়ে। সাথে চলছে নিদারুন গবেষনা। আজ আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হল ইউ.এফ..। এখন প্রশ্ন হল, কি এই ইউ.এফ..? ইউ.এফ.. (UFO) কথাটির পুরো অর্থ হল “আনআইন্ডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট” (Unidentified Flying Object)। আকাশে এমন কোনও বস্তুকে উড়ন্ত অবস্থায় দেখা যায় যদি, যেটি আমাদের পরিচিত কোনো যানের সাথে না মেলে এবং কোনো সংস্থা দ্বারা সেটিকে উড়ানোর প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া না যায়, তখন তাকে আমরা ইউ.এফ.. (UFO) বলে থাকি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই সব অদ্ভূত মহাকাশে উড্ডয়নরত বস্তুর আকস্মিক আবির্ভাব বহুবার দেখা গেছে। UFO শব্দটি প্রথম ব্যবহার করে ইউ.এস.এয়ারকোর্সের অফিসার এডওয়ার্ড রুপেল্ট। সালটা হল ১৯৫২। অবশ্য তার আগে একে “উড়ন্ত চক্কি” নামে ডাকা হত। কেনেথ আর্নল্ড নামক এক ব্যক্তি ১৯৪৭ সালের জুন মাসে একসাথে এরকম ৯টি উড্ডয়ন চাকতিকে দেখেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিজ্ঞানী, আধিকারিক ও সাধারন মানুষদের মধ্যে এই সব রহস্য সঞ্চারকারী আকাশযানকে নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়। অনেকের ধারনা UFO -এর মধ্যে লুকিয়ে আছে অন্যান্য গ্রহ ও সেইসব গ্রহের প্রাণীদের সম্বন্ধে যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। এইসব বিষয়ে গবেষণা করার জন্য আমেরিকা যুক্তরাস্ট্রের ম্যারিল্যান্ড -এ গঠিত হয় “দি ফান্ড ফর ইউ.এফ.. রিসার্চ” নামে একটি সংস্থা।

Picture courtesy: Wikipedia


      বিশ্বের বহু জায়গায় UFO দেখার খবর পাওয়া যায়। ১৯৪৭ সালে মেক্সিকোতে একজন চাষি দাবি করেন UFO -এর ধ্বংসাবশেষ মাটিতে পড়ে থাকার। রস্‌ওয়েল আর্মির বায়ুসেনারা সেখানে গিয়ে খুঁজে পান আবহাওয়া পর্যালোচনায় ব্যবহৃত বেলুন ও যন্ত্রপাতির ধ্বংসাবশেষ। এছাড়া অনেক বিমানচালক মাঝেমধ্যে UFO দেখার রিপোর্ট করেন। কিন্তু প্রতিক্ষেত্রেই তদন্ত করার পর দেখা যায় সেগুলি হয় কোনো উড়োজাহাজ বা বেলুন জাতীয় বস্তু। কখনও কখনও রাতের আকাশে অতিরিক্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র বা গ্রহের ফলেও এই ভ্রম তৈরী হয়। ইউ.এস.. নেভি প্রায় ৩০,০০০ ফুট উচ্চতায় এক বৃহৎ আকাশযান যেটি হাওয়ার গতির উল্টো দিকে ঘুরতে ঘুরতে যেতে দেখে। এছাড়া ২০১৩ সালে ভারতের লাদাখে আর্মিরা প্রায় একশো রকমের বিভিন্ন UFO দেখতে পাওয়ার খবর রিপোর্ট করেন।

      আমাদের রাজ্যে ২০০৭ সালে ই.এম. বাইপাসের ধারে ভোরের আকাশে গোলাকার চাকতি দেখা যায়। এই গোলাকার আলোক উৎস ক্রমশ ত্রিভুজাকার হয়ে যেতে থাকে। লোকজন এটিকে UFO বলে হইচই শুরু করে দেয়। পরবর্তিকালে, বিড়লা প্লান্টেরিয়ামে ডিরেক্টর, বিশ্ববিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডঃ ডি.পি. দোয়ারি এটাকে শুক্র গ্রহ বলে চিহ্নিত করেন। শুধুমাত্র আধুনিক যুগে নয়। প্রাচীন ভারতে চারামাতে (কানকেড়, ছত্তিশগড়) এক গুহাচিত্র পাওয়া গেছে যেখানে এক উড়ন্ত চক্কি রয়েছে অ্যান্টেনাসহ এবং একজন মহাকাশচারী রয়েছেন। এছাড়া ১৪৪০ খ্রীঃ পূর্বাব্দে প্রাচীন মিশরে, ২১৮ খ্রীঃ পূর্বাব্দে রোমে, প্রাচীন গ্রিসে এরকম উড়ন্ত চাকতি দেখতে পাওয়ার বহু ঘটনা লিপিবদ্ধ আছে। বেশীর ভাগ ইউ.এফ.. একটি বৈশিষ্ট্য হল এদের আকার সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়।  

কিন্তু সত্যি কি ইউ.এফ.. হল বহির্জগতের বা অন্য গ্রহের প্রাণীদের যান?

      এখনো পর্যন্ত যত UFO দেখা গেছে, কোনটার ক্ষেত্রেই এমন কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি যে সেগুলি বাইরের জগতের। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা সংস্থার মতে UFO দর্শন হল মানুষের মধ্যে এক প্রকার অতি উৎসাহের জাগরণ। এছাড়া বিভিন্ন উড়ন্ত যান, আবহাওয়া বেলুন, মিশাইল, যুদ্ধ বিমান ও গ্রহ-নক্ষত্রের আলোকে UFO বলে ভূল করে বসে। তবুও গবেষণা চলছে। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই রহস্যের এক সর্বজনগ্রাহ্য সমাধান বের হবে।

No comments:

Post a Comment